পাড়ার চায়ের দোকান। হঠাৎ এক তীব্র নীল আলো চকমক করে উঠল। দোকানের বেঞ্চে বসা গতানুগতিক বাস্তব কদম আলীর ঠিক পাশেই অবিকল তাঁর মতোই দেখতে আরেকজন এসে বসলেন—তবে তাঁর গায়ের চামড়া সামান্য সবুজাভ আর চোখে একটা অদ্ভুত যান্ত্রিক চশমা। তিনি ‘এলিয়েন কদম আলী’।
নিচে দুই কদম আলীর মধ্যকার সেই মহাজাগতিক ও অর্থনৈতিক কথোপকথন:
বাস্তব কদম আলী: ওরে বাবারে! ভূত নাকি হে? তুমি দেখতে হুবহু আমার মতো কেন?
এলিয়েন কদম আলী: শান্ত হোন, পৃথিবীর কদম আলী। আমি গ্যালাক্সি-৯ এর ফিসকাল-প্ল্যানেট থেকে আসা আপনারই অল্টারনেটিভ সংস্করণ—এলিয়েন কদম আলী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার কম্পন তরঙ্গ মহাকাশে পৌঁছেছে। তাই দেখতে এলাম আপনাদের ‘পরিকল্পনার পরী’র কী দশা!
বাস্তব কদম আলী:ওহ, বাজেটের কথা আর বোলো না ভাই। আমার তো মনে হচ্ছে এবারের পৌনে দশ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট একটা কাগজের পরী। আইএমএফ-এর শর্তের চাপে আমাদের পকেট কাটার বন্দোবস্ত হচ্ছে। নিত্যপণ্যের উৎসে কর বাড়ছে, বাজারের ব্যাগে হাত দিলেই ছ্যাঁকা লাগার দশা। এই পরী ডানা মেলার আগেই তো আমাদের ডানা কেটে দিচ্ছে!
এলিয়েন কদম আলী: হুম, আপনার পর্যবেক্ষণ আংশিক সত্য, বাস্তব কদম আলী। আমি আমার কোয়ান্টাম কম্পিউটারে আপনাদের বাজেট ডাটা স্ক্যান করলাম। আপনাদের বাজেট ঘাটতিই তো প্রায় ২.৩৫ লাখ কোটি টাকা! এই ঘাটতি পূরণে আপনাদের সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নেওয়ার মহাজাগতিক পরিকল্পনা করেছে।
বাস্তব কদম আলী: ওই তো! সরকার সব টাকা ব্যাংক থেকে ধার নিলে আমাদের মতো সাধারণ ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবে কোত্থেকে? ব্যবসা না টিকলে চাকরি থাকবে? এই পরিকল্পনার পরী তো ঋণের সুতোয় বাঁধা এক জড় বস্তু, উড়বে কীভাবে?
এলিয়েন কদম আলী: আমাদের গ্রহে আমরা বাজেট দিই ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’ (System Trust) বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে। সেখানে কোনো মানুষ কর নির্ধারণ করে না, কোনো এনবিআর (NBR) কর্মকর্তা ফাইল আটকে ঘুষ নিতে পারে না। পুরো ইকোসিস্টেম ডিজিটালি ইন্টিগ্রেটেড। কিন্তু আপনাদের এই বাজেটে আমি দেখতে পাচ্ছি, কর আদায়ের জন্য এখনও সেই প্রাচীন এনালগ আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরতা! মানুষের হস্তক্ষেপ যেখানে বেশি, সেখানে পরিকল্পনার পরী তো দুর্নীতির ব্ল্যাকহোলে পড়ে ক্র্যাশ করবেই।
বাস্তব কদম আলী:খাঁটি কথা বলেছ এলিয়েন ভাই! আমাদের এখানে আইনের খসড়া হয় চমৎকার, কিন্তু বাস্তবায়নে গেলেই সেটা রূপকথা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ মুষক-৬.৩ ইনভয়েস বোঝে না, আর বড় বড় শপিং মল আমাদের কাছ থেকে ভ্যাট নিলেও সেটা সরকারি তহবিলে জমা দিচ্ছে কিনা, তার কোনো ডিজিটাল গ্যারান্টি নেই।
এলিয়েন কদম আলী: স্পট অন, আর্থ-কদম! আপনাদের এই বাজেটে ‘ট্রিপল হিট’ (Triple Hit) বা ত্রিমুখী ঝুঁকির কোনো শক্তিশালী অ্যান্টি-ডোট আমি দেখছি না। একদিকে ভ্যাটের চাপ, অন্যদিকে ডলারের অস্থিরতা, আর সাথে ক্রমবর্ধমান সুদের হার—এই তিনের ধাক্কায় সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা তো মহাকাশের ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে। আপনাদের পরিকল্পনার পরী আসলে কোনো ডানাওয়ালা পরী নয়, এটা একটা কৃত্রিম বেলুন, যা একটুখানি মূল্যস্ফীতির চাপেই ফেটে যেতে পারে।
বাস্তব কদম আলী: তবে উপায়? আমরা কি চাতক পাখির মতো চেয়েই থাকব? আমাদের বাঁচানোর কি কোনো উপায় নেই?
এলিয়েন কদম আলী: উপায় আছে। যদি এই কাগজের পরীকে সত্যি ওড়াতে হয়, তবে কর ব্যবস্থাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত ও মানব-স্পর্শহীন স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। সাধারণ মানুষকে ‘ইনক্লুসিভ ভ্যাট’ বা কর-সহ পণ্যের দাম নির্ধারণের সুবিধা দিতে হবে, যাতে কেউ প্রতারিত না হয়।
বাস্তব কদম আলী: চমৎকার বলেছ ভাই। নাও, এক কাপ চা খাও। আমাদের বাজেট হয়তো এনালগ, কিন্তু আমাদের চা-টা একদম খাঁটি এনালগ পাতার!
এলিয়েন কদম আলী: বাহ, চমৎকার লিকুইড এনার্জি! আমি মহাকাশে ফিরে গিয়ে রিপোর্টে লিখব—ভূপৃষ্ঠের ২০ launch বাজেটের পরিকল্পনার পরী উড়বে কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবে বাস্তব কদম আলীদের টিকে থাকার লড়াইটা সত্যিই মহাজাগতিক!